রাশিদুল ইসলাম জুয়েল, সিঙ্গাপুর: তখন ছোট ছিলাম। তখনো বিশ্বকাপ ফুটবল ছিলো, ছিলো আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের সাপোর্টার। তবে প্রযুক্তির এতো উৎকর্ষ তখন ছিলো না। সেসময় প্রতিদিন বিকালবেলা মাঠে খেলতে যেতাম। মোবাইল ফোন ছিলো না বলে সবার জন্য মাঠে উপস্থিত হওয়ার একটা সময় দেওয়া থাকতো। সবাই ঠিক সময়েই যার যার কাজ সেরে মাঠে হাজির হতো। এতে সবার মাঝেই সময়ানুবর্তিতার একটা শিক্ষা গোপনে গোপনে হয়ে যেতো। বিশ্বকাপ এলেই সবার মাঝে একটা উন্মাদনা লক্ষ্য করতাম। খেলার মাঠে মাঝে মাঝেই এলাকার বড় ভাইয়েরা বসে আড্ডা দিতেন। সেখানে তাঁদের মাঝে আর্জেন্টিনা সমর্থক যেমন ছিলেন, তেমনি ব্রাজিল সমর্থকও ছিলেন। বিশ্বকাপে কোন্ দল ভালো, কোন্ দল খারাপ তা নিয়ে বিতর্ক হতো তাঁদের মাঝে। সেসব বিতর্কে যুক্তি ছিলো, জিজ্ঞাসা ছিলো, আত্মসমালোচনা ছিলে। বর্তমানে ট্রল বলে যে জিনিসটা আছে তা তখনো আবিষ্কার হয়নি। বয়সে যারা বড় ছিলেন, তাঁদের প্রতি যথাযথ সম্মান রেখেই ছোটরা তাদের জিজ্ঞাসা বা মতামত দিতো। আমি সেই প্রাণবন্ত আড্ডার দর্শক হতাম মাঝে-মধ্যে। ছোট ছিলাম বলে সেই আড্ডায় সক্রিয় না হলেও আমার জানার সীমার মধ্যে কোনো বিষয় এলে প্রায়ই মতামত দিতাম। সেই জ্ঞানগর্ভ আলোচনায় যারা অংশ নিতো, তারা বড়দের সম্মান ও ছোটদের স্নেহ করা এবং বিনয়ী হওয়ার একটা শিক্ষা পেয়ে যেতো। সময়ের পরিক্রমায় সেই আড্ডার ধরণ বদলেছে। প্রযুক্তির উৎকর্ষে এক প্রজন্মের সংগে আরেক প্রজন্মের দূরত্বও তৈরি হয়েছে।

২০০৬ বিশ্বকাপের ঘটনা। সেই বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা হেরে যায়। নতুন প্রজন্মের ব্রাজিল সাপোর্টাররা মিছিল বের করে। ভাবছেন ব্রাজিলের সংগে খেলা ছিলো? না, আর্জেন্টিনা জার্মানির কাছে টাইব্রেকারে হেরেছিলো। এতেই আনন্দিত হয়ে ব্রাজিল সাপোর্টাররা মিছিল করেছিলে। পরদিন ব্রাজিল ফ্রান্সের কাছে ১-০ গোলে হেরে বিদায় নেয়। ফলে আগের দিনের ব্রাজিল সমর্থকদের মিছিলের জবাব দেয় আর্জেন্টিনা সমর্থকগোষ্ঠি। তারা আরো বড় মিছিল বের করে।

এরপর আসে ২০১০ বিশ্বকাপ। ততোদিনে নতুন নতুন প্রযুক্তি মানুষের হাতের মুঠোয়। আধুনিক এই যুগে মানুষ এনালগ থেকে ডিজিটাল হয়ে ওঠেন। সবাই মনের রাগ, ক্ষোভ, অভিমান, ভালোবাসা কাছের বন্ধু বা মানুষের কাছে আর বলেনন না। জানান দেন ফেসবুকে। এখানে বড়দের সম্মান করার ঝামেলা নেই, বিনয়ী হওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই, নেই নিজের ব্যক্তিত্ব ঠিক রাখার চিন্তা। ফলে আবিষ্কার ঘটে ট্রলের। সবাই নিজের ইচ্ছামতো ট্রল করে অন্যদের। বিশ্বকাপে এই ট্রল পায় নতুন মাত্রা। পছন্দের দলের সংগে যে দলের খেলা তাদের নিয়ে মানুষ যতোটা না ট্রল করে, তার চেয়ে বেশি ট্রল করে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলকে নিয়ে। এই ট্রলে থাকে না কোনো যুক্তি, থাকে না কোনো জিজ্ঞাসা। এই বিশ্বকাপেও ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনা ব্যর্থ হয়। তবে সমর্থকদের মুখের জোর কমে না। তাঁরা আত্মসমালোচনা যতোটা না করেন তার চেয়ে একে অন্যের পেছনে লেগে থাকেন বেশি।

বর্তমানে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা সমর্থকদের কর্মকাণ্ড এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তাঁদের আর সমর্থক বলে মনে হয় না। তাঁরা এখন এন্টি ব্রাজিল, এন্টি আর্জেন্টিনা সাপোর্টার। বিনয়, ব্যক্তিত্ব, শ্রদ্ধাবোধ বিসর্জন দিয়ে এখন সবাই একে অন্যকে হেনস্তা করতে পারলেই খুশি। প্রযুক্তি আমাদের আধুনিক করেছে, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে সৌহার্দ্য।

লেখক: রাশিদুল ইসলাম জুয়েল, সিঙ্গাপুর প্রবাসী সাংবাদিক ও লেখক।