ইয়াসির ইয়ামীন: একেই বলে অসহায় আত্মসমর্পণ। লর্ডসে প্রথম ইনিংসের মতোই ভারতীয় দ্বিতীয় ইনিংসের তাসের ঘর একে একে ভেঙে পড়ছিলো। লড়াইয়ের কোনো তাগিদই লক্ষ্য করা গেলো না। যেন হারার আগেই হেরে বসে রয়েছে দল। ‘টিম ইন্ডিয়া’র এমন করুণ পারফরম্যান্স দেখে হতাশ ও বিরক্ত ভক্ত-সমর্থকরা। লর্ডস-লজ্জার এই চিত্রনাট্য ভারতীয় ক্রিকেটের ভিত্তিমূল পর্যন্ত নাড়িয়ে দিয়েছে। যে প্রত্যাশার বেলুন আকাশে উড়িয়ে ‘টিম ইন্ডিয়া’ ইংল্যান্ডে হাজির হয়েছিলো, তা এমন চুপসে যাবে, কে-ই বা ভেবেছিলেন।

জানা কথা, মেঘলা আকাশ এবং বৃষ্টির আবহাওয়ায় ইংল্যান্ডের পিচে ব্যাট করা সবসময়ই কঠিন। সেই পিচে জেমস অ্যান্ডারসন কিংবা স্টুয়ার্ট ব্রডের মতো বিধ্বংসী পেসাররা লাল ডিউক বল নিয়ে দৌড়ে এলে ব্যাটসম্যানদের কাজ আরো কঠিন হয়ে যায়। তাই বলে টেস্ট ক্রিকেটে বিশ্বের এক নম্বর দলের কাছ থেকে এমন ফলাফল কি প্রত্যাশিত? লর্ডসে দু’বার অল-আউট হয়েছে ভারত। সব মিলিয়ে ব্যাট করেছে ৮২.২ ওভার, অর্থাৎ টেস্টের একটি পুরো দিনও নয়।

লর্ডসে ইংল্যান্ডের কাছে লজ্জাজনক ইনিংস হারের পর দল গঠনের ভুল স্বীকার করেছেন কাপ্তান কোহলি। দলের ব্যাটিং ব্যর্থতাকে দায়ী করে বলেছেন, ‘দ্বিতীয় টেস্টে হারার মতোই খেলেছে ভারত। তবে হতাশার মাঝেও সতীর্থদের ওপর ভরসা রেখে কোহলি আহ্বান জানান, সিরিজের বাকি তিন টেস্টে ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষ্যে খোলা মনে নিজেদের সেরাটা মেলে ধরতে হবে।’

এজন্য দলে পরিবর্তনের কথাও ভাবা হচ্ছে। কিন্তু ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যতোই রদবদল করা হোক না কেন, ভুলে গেলে চলবে না, টেস্ট ক্রিকেট অন্য লড়াই। এখানে ব্যাটসম্যান উইকেট দেয় না। তাকে দিয়ে ভুল করিয়ে উইকেট তুলে নিতে হয়।

প্রাচীন পাঠ আবারো!

তিন বছর আগে শ্রীলঙ্কার গল-এ জেতা ম্যাচ হেরেছিলো ‘টিম ইন্ডিয়া’। সেদিন কোচ রবি শাস্ত্রী বলেছিলেন, ‘এখান থেকে আমরা কেউ বের হবো না। যতোক্ষণ না উত্তর খুঁজে পাচ্ছি, কেন জেতা ম্যাচ হেরে গেলাম, ততোক্ষণ এক্সিট ডোর বন্ধ।’ শাস্ত্রীর নির্দেশমতো ড্রেসিংরুমেই দেড় ঘণ্টা ধরে ময়নাতদন্ত করেছিলো দল। এর পরই সিরিজে দুর্দান্ত কাম-ব্যাক করেছিলো ‘টিম ইন্ডিয়া’। বাকি দুই টেস্টে জিতে চব্বিশ বছর পরে শ্রীলঙ্কায় টেস্ট সিরিজ জিতেছিলো ভারত।

রবিবার (১২ আগস্ট) লর্ডসেও গল-এর মতোই ময়নাতদন্ত করে মাঠ ছেড়েছে ‘টিম ইন্ডিয়া’। সোমবার (১৩ আগস্ট) সকালে টিম হোটেলে আরেক দফা মিটিং করেছে। ময়নাতদন্তে সর্বাধিক গুরুত্ব পেয়েছে, বিপর্যয়ের স্মৃতি মুছে তিন টেস্টের লড়াই হিসেবে এই সিরিজকে দেখা এবং দুর্যোগ কাটাতে গল-এর বদলে ওয়ান্ডারার্স-কে স্মৃতিতে ফিরিয়ে আনা।

প্রসংগত, দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথম দুই টেস্টে হারার পর তৃতীয় টেস্টে ফ্যাপ ডুপ্লেসিসদের বানানো অগ্নিসম উইকেটে তাঁদের হারিয়ে সম্মান পুনরুদ্ধার করেছিলো ‘টিম ইন্ডিয়া’। সেই উদাহরণ টেনে ময়নাতদন্তের সারমর্ম নির্ধারিত হয়েছে, ‘দক্ষিণ আফ্রিকায় আমরা পারলে, এখানে পারবো না কেন? ওখানে পরিস্থিতি আরো কঠিন ছিলো। পিচ ছিলো খেলার অযোগ্য।’ দক্ষিণ আফ্রিকায় কাম-ব্যাক করেও বিশেষ লাভ হয়নি, কারণ সিরিজের ফয়সালা হয়ে গিয়েছিলো। নটিংহ্যামের ট্রেন্টব্রিজে কাম-ব্যাক করতে পারলে সিরিজ জমে উঠতে পারে। পক্ষান্তরে ট্রেন্টব্রিজে তৃতীয় টেস্ট জিতলেই পতৌদি ট্রফি হবে ইংল্যান্ড দলের।

মান বাঁচাতে মরিয়া ‘টিম ইন্ডিয়া’ দলে রদবদল করেই শনিবার (১৮ আগস্ট) মাঠে নামবে। ইংল্যান্ড দল মোটামুটি অপরিবর্তিত থাকছে। বাড়তি হিসেবে ট্রেন্টব্রিজের আগেই দলে ফিরেছেন ইংল্যান্ডের বেন স্টোকস। নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে এর পর থেকেই। প্রশ্ন উঠেছে, ইংল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ড একদিকে আচরণ নিয়ে কোনো আপোষ না করার শপথ নিচ্ছে। অন্যদিকে রাস্তায় মারামারি করা ক্রিকেটারকে দলে রাখছে! যদিও পানশালার বাইরে রাস্তায় মারামারির অভিযোগ থেকে খালাস পেয়েছেন স্টোকস। কিন্তু আদালত নিষ্কৃতি দিলেও জনতার আদালত থেকে কি সহজে মুক্তি মিলবে?

প্র্যাকটিসের অভাবেই এমন ফলাফল?

ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে পরপর দুই টেস্টে হেরে যথেষ্ট বিপাকে রয়েছে ‘টিম ইন্ডিয়া’। এই ব্যর্থতার জন্য ক্রিকেটারদের পর্যাপ্ত অনুশীলনের অভাবকেই দায়ী করছেন ভারতীয় সাবেক ক্রিকেটাররা। কেউ কেউ বলছেন, ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের টেস্ট খেলার বেসিক টেকনিক ও টেম্পারামেন্টেই আসল গলদ রয়েছে।

সর্বশেষ দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে কেপটাউন টেস্টে ২০৮ রান তুলতে পারেনি ভারতীয় দল। তখন বলা হয়েছিলো, দক্ষিণ আফ্রিকার উইকেটের সংগে ধাতস্থ হতে না পারায় উইকেট ছুঁড়ে দিতে হয়েছে ব্যাটসম্যানদের! কিন্তু ইংল্যান্ডে? দেড় মাস আগে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমানোর পেছনে তো একটাই উদ্দেশ্য ছিলো, পরিবেশের সংগে নিজেদের মানিয়ে নেওয়া। ১৯৯৬ সালে ভারত তো ইংল্যান্ডে ১০টিরও বেশি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলেছিলো। তবু সিরিজ জিততে পারেনি। এবার তো এর কাছাকাছি সংখ্যক প্রস্তুতি ম্যাচও খেলেনি ‘টিম ইন্ডিয়া’।

সাধারণত বিদেশ সফরকালে ব্যাটসম্যানদের বেশি বেশি প্র্যাকটিস করতে দেখা যায়। কেউ কেউ আলাদা করে নেটে সময় কাটান, সফল হওয়ার জন্য। কিন্তু লর্ডসে লজ্জাজনক হারের পরও রাহুল, বিজয়, রাহানেরা মাঠমুখো হননি। কিংবা কেউ নেটে গিয়ে অ্যান্ডারসনদের সুইং বল মোকাবিলার কৌশল সন্ধান করেছেন- এমনও শোনা যায়নি। অবশ্য তাঁরা নাকি জিম ও সুইমিং পুল সেশন করেছেন।

ক্রিকেটপ্রেমীদের প্রশ্ন, শুধু পেশি শক্তি দিয়ে কি অ্যান্ডারসনদের সুইং বোলিং মোকাবিলা করা যাবে? প্রশ্ন আরো উঠছে। বৃষ্টি এসে বৃহস্পতিবার বা শুক্রবারের অনুশীলন যদি ভেস্তে দেয়, তাহলে ট্রেন্টব্রিজে অগ্নিপরীক্ষার আগে প্রস্তুতিতে ঘাটতি থাকবে কি না?

ভারতের ইংরেজি দৈনিক ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’ লিখেছে, ‘ওয়ান ডে সিরিজে ইংল্যান্ডের কাছে ১-২ ব্যবধানে হারের পর এজবাস্টনে প্রথম টেস্ট শুরুর আগে প্রস্তুতির জন্য দুই সপ্তাহ সময় পেয়েছিলো বিরাট বাহিনী। কিন্তু ক্রিকেট জীবনের মতোই প্রশিক্ষক জীবনেও শৃঙ্খলাহীন কোচ রবি শাস্ত্রী ভারতীয় ক্রিকেটারদের স্রেফ বিশ্রাম দিয়ে এদিক-ওদিক চরে বেড়িয়েছেন। বিসিসিআইয়ের উচিত, কোচ রবি শাস্ত্রীর কাছে লিখিতভাবে এই ব্যর্থতার কারণ চিহ্নিত করে জবাবদিহি চাওয়া।’

ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, ইংল্যান্ডে সীমিত ওভারের সিরিজ খেলে পরিবেশের সংগে মানিয়ে নেওয়ার যথেষ্ট সুযোগ পেয়েছিলেন ভারতীয় ক্রিকেটাররা। কিন্তু একটি প্র্যাকটিস ম্যাচ ছাড়া খুব বেশি অনুশীলন করেননি তাঁরা। বিশ্রামের নামে শপিং করে সময় কাটিয়েছেন অনেকে। এই প্র্যাকটিস ম্যাচ নিয়েও নানান কথা শোনা যাচ্ছে। প্রথমে কথা ছিলো, ভারতীয় দল সাসেক্সের বিরুদ্ধে চারদিনের প্র্যাকটিস ম্যাচ খেলবে। কিন্তু ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্টের অনুরোধেই নাকি সেটি তিন দিন করা হয় ।

১৫ আগস্ট বিরাটরা ইংল্যান্ডের ভারতীয় দূতাবাসে পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন। এরপর নটিংহ্যামের পথে রওনা দিয়েছেন।
অর্থাৎ, বুধবারও ব্যাট-বলের সংগে সম্পর্ক হয়নি তাঁদের। তাহলে টেস্টের আগে বাকি থাকলো দুই দিন। ক্রিকেটবোদ্ধা না হয়েও এই প্রশ্ন করা যায়, ইংল্যান্ডের মাটিতে ভারতীয় মহাতারকা খেলোয়াড়দের যা অবস্থা দেখা যাচ্ছে, তাতে মাত্র দু’দিনের অনুশীলনেই গোটা দল নিজেদের মরচে ধরা ফর্ম মেরামত করতে পারবে?

এতো সোজা? যে খেলার জন্য আজ তাঁদের এতো নাম-যশ, সেই খেলাকে এভাবে অবহেলা করা যায়? নটিংহ্যামে ভারত টেস্ট জিতলেও বলবো, যায় না।’

এ প্রসংগে একটি মন্তব্যই হয়তো করা যায় (আবার ভারতীয় দলের আঁতে ঘা লাগে কি না?)।

ইতিহাসের বই পড়ে যেমন যুদ্ধে যাওয়া যায় না কিংবা যুদ্ধে জেতা যায় না, তেমনি হোটেল বা টিম রুমে একের পর এক মিটিং করেও মাঠে ভালো খেলা যায় না। এই অপ্রিয় আপ্তবাক্যটি ‘টিম ইন্ডিয়া’ যতো দ্রুত অনুধাবন করতে পারবে, ততোই ক্রিকেটের মঙ্গল।

ভয়েস বাংলা # ইই