ইয়াসির ইয়ামীন: ভারতের ব্যাটিং নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হচ্ছে লর্ডস টেস্টে ইনিংস ব্যবধানে হারার পরে। এ নিয়ে কথা বলছেন সাবেক ক্রিকেটাররা। বিরাট কোহলি’র নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন কেউ কেউ। অবশ্য সাবেক অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলী বর্তমান টিম ম্যানেজমেন্টের পাশেই দাঁড়িয়েছেন। তিনি বলেন, ‘বিরাট কি রান পাচ্ছে না? বিরাট কি ভালো খেলছে না? তাহলে ওর নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে কেন? আমরা তো বিরাটের নেতৃত্বের জন্য হারছি না। হারছি ব্যাটসম্যানরা উইকেটে দাঁড়াতে পারছে না বলে। তাই নেতৃত্বের ব্যাপারে বিরাটকে ‘বেনিফিট অব ডাউট’ দিতেই চান সৌরভ। যদিও সৌরভ আগে বলেছিলেন, ‘এতো ডিফেন্সিভ মানসিকতা নিয়ে জয় পাওয়া মুশকিল।’

লর্ডসে চেতেশ্বর পূজারা সেট হওয়ার পরও যেভাবে ব্যাট-প্যাডের মধ্যে দিয়ে বল গলে বোল্ড হয়েছেন, তাতে তাঁর টেকনিক নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। আউট হওয়ার ঠিক আগেই একটি ‘ওভার-পিচ্ড’ বল ডেড ডিফেন্স করেন পূজারা। যা দেখে কমেন্ট্রি বক্সেও অনেকে আঁতকে ওঠেন। চার বছর আগে লর্ডসে সেঞ্চুরি করা আজিঙ্কা রাহানে চলতি সফরে চার ইনিংসে চারবারই উইকেটের পেছনে খোঁচা দিয়ে আউট হয়েছেন।

তাই লর্ডসে হারের পর দলগত সংহতির কথা যতোই বলা হোক, মিলিত প্রচেষ্টার কথা যতোই শোনানো হোক; এটাই তো সত্যি যে, বিরাট কোহলি রান না পেলে এখান থেকে ভারতীয় দলের সিরিজ জিতে ফেরা দূর-কল্পনা ছাড়া কিছু নয়। কারণ, সুইং বোলিংয়ের সামনে ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের যে দুর্বলতা অতীতে ছিলো, বর্তমান দলেও ওই দুর্বলতার পরিমাণ অনেক বেশি। এছাড়া লর্ডস টেস্টের প্রথম ইনিংসে ইংল্যান্ড সব ক্যাচ ধরতে পারলে ভারত তো ১০৭ পর্যন্ত পৌঁছতেই পারতো না। তাই এখন কোহলিদের হোয়াইটওয়াশ বাঁচাতেই লড়তে হবে।

ইংল্যান্ডে দু’ধরনের চ্যালেঞ্জের সামনে পড়তে হয় ব্যাটসম্যানদের। প্রথমে বল হাওয়ায় সুইং করে, তারপর পিচে পড়ে সিম করে। অর্থাৎ যতোক্ষণ না বল ব্যাটে লাগছে অথবা ব্যাটের পাশ দিয়ে বেরোচ্ছে, ততোক্ষণ রক্ষা নেই। অ্যান্ডারসনের অস্ত্রই হচ্ছে লেট সুইং। অপেক্ষা করে না খেললে তাঁর সামনে মুখ থুবড়ে পড়তে হবে। ঠিক সেটাই হচ্ছে ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের। স্টুয়ার্ড ব্রড বা জেমস অ্যান্ডারসনদের বল নড়ছে ইংলিশ কন্ডিশনে। একইসংগে ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের আত্মবিশ্বাসও।

ভারতের সাবেক ক্রিকেটার বিষেণ সিং বেদী বলেন, ‘ওয়ান ডে এবং টি-টুয়েন্টি খেলে টেস্টে ব্যাট করার বেসিক টেকনিক ভুলে গেছে ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা। তারা জানে, ওয়ান ডে ও টি-টুয়েন্টি খেললেই টাকা আসবে। টেস্ট ক্রিকেটের কদর করবে কেন?’

চলতি টেস্ট সিরিজে ভারতীয় ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্স দেখে ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক নাসের হুসেইন বলেন, ‘ভারত এই মুহূর্তে বিশ্বের এক নম্বর টেস্ট দল। কিন্তু খেলায় তার প্রতিফলন কোথায়? লর্ডস টেস্টে ভারতীয় ক্রিকেটারদের অসহায় আত্মসর্পণ দেখে মনে হচ্ছিলো, একদল পেশাদার প্রাপ্তবয়স্ক ক্রিকেটারদের বিরুদ্ধে খেলছে কিছু নবাগত বালক। সিরিজ শুরুর আগে মনে হয়েছিলো দারুণ লড়াই হবে। কিন্তু পর পর দু’টি ম্যাচ দেখে মনে হচ্ছে ইংল্যান্ড একতরফা সিরিজ পকেটে পুরবে।’

ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক জেফ্রি বয়কট ব্রিটিশ মিডিয়ায় নিজের কলামে লিখেছেন, ‘সিরিজে এখনো পর্যন্ত ভারতীয় ক্রিকেটাররা সমর্থকদের হতাশই করে চলেছে। ভারতের ব্যাটিং ভীষণ কাঁচা, দায়িত্বজ্ঞানহীন। প্রায় নির্বোধের মতো ব্যাটিংই বলা যায়। আউটসুংইয়ের ফাঁদে পড়ে যেভাবে ড্রাইভ করতে ব্যাট বাড়িয়ে দিচ্ছে, তা চিন্তা-ভাবনা না করে খেলার লক্ষণ।’

লর্ডস টেস্ট চলাকালে কমেন্ট্রি বক্সে ইংল্যান্ডের সাবেক তারকা ডেভিড গাওয়ার, ইয়ান বোথাম, নাসের হুসেইনরা বলাবলি করছিলেন, বেশি সময় নষ্ট না করে ইনিংস ছেড়ে দেওয়াই ভালো। যদি বৃষ্টি এসে নিশ্চিত জয় আটকে দেয়। গাওয়ার, বোথামরা একটু বেশিই আশা করছিলেন ভারতীয় ব্যাটিংয়ের কাছ থেকে। বৃষ্টিতে প্রথম দিনে একটিও বল হয়নি। শেষ দিনের দরকারই হলো না। আড়াই দিনেই টেস্টের ভবলীলা সাঙ্গ এবং ইনিংস হার।

শ্রীলঙ্কার সাবেক অধিনায়ক কুমার সাঙ্গাকারা বললেন, বিরাট কোহালি’র ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার জন্যই ইংল্যান্ডে প্রথম দুই টেস্টে ভারতের ভরাডুবি হয়েছে বলে মনে করেন না তিনি। তাঁর মতে, ‘বিরাট গত কয়েক বছর ধরেই ধারাবাহিকভাবে পারফর্ম করছে। পাশাপাশি ভারতের অন্য ব্যাটসম্যানরাও দারুণ। প্রথম দুই টেস্টে ভারতের সমস্যায় পড়ার কারণ হয়তো প্রস্তুতির অভাব।’

লর্ডস টেস্ট চলাকালে আজিঙ্কা রাহানে সাংবাদিক সম্মেলনে এসে দাবি করেছেন, ভারত এখনও ম্যাচ জিততে পারে। শুনে হাসাহাসি হচ্ছিলো। ‘এই অবস্থা যাঁদের ব্যাটিংয়ের, তাঁদের ভবিষ্যদ্বাণীতে কে বিশ্বাস রাখবে! আগে জিতুক, তারপর দেখা যাবে।’ লর্ডস টেস্টে ইংল্যান্ডের উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান জনি বেয়ারস্টো এবং ক্রিস ওকসের ১৮৯ রানের জুটি ভেঙে দিয়েছিলো ভারতের মেরুদ-। ভারতের দ্বিতীয় ইনিংসে স্টুয়ার্ট ব্রড ও অ্যান্ডারসনের সুইং কোণঠাসা করে দিয়েছিলো বিরাট কোহলিদের। তবু বেয়ারস্টো’র কণ্ঠে ভারতীয় দলের জন্য সমীহ।

তিনি বলেন, ‘কোনো কারণ ছাড়া টেস্ট র্যাংকিংয়ে শীর্ষস্থান ধরে রাখা যায় না। ভারত যে সেই স্থানের যোগ্য সেটা আগে প্রমাণ করেছে। এখনও সিরিজে অনেক ক্রিকেট বাকি। আমরা ৫-০-তে জিতবো কি না তা এখনই বলা উচিত হবে না।’

পরিস্থিতি বেগতিক দেখে কোহলি সোস্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, ‘সবাই চেষ্টা করছে। এতো দ্রুত উপসংহারে পৌঁছে গেলে ভুল হবে। আমরা টিমের মধ্যে ধৈর্য ধরতে চাই। ব্যাটিংয়ের ক্ষেত্রে সমস্যাটা টেকনিক্যাল নয়, মানসিক। এছাড়া আমরা কখনো জিতি, কখনো আবার শিখি। আপনারা সমর্থন ছাড়বেন না। আমরা কথা দিচ্ছি, আপনাদের হতাশ করবো না।’ ক্রিকেটপ্রেমীরাও বিরাটের এই আশাবাদে আস্থা রাখতে চান। কথায় বলে না, অন্ধকার চিরন্তন নয়। আলোর রাস্তা ঠিকই থাকে। শুধু খুঁজে পাওয়ার ইচ্ছাটা থাকতে হয়!

ভয়েস বাংলা # ইই