21.7 C
Dhaka
১১ ডিসেম্বর, মঙ্গলবার , ২০১৮ ০৭:২৫:৫৬ অপরাহ্ণ
ভয়েস বাংলা
জাতীয় বিশেষ

কী আলোচনা হয়েছে গতকাল গণভবনে?

নিজস্ব প্রতিবেদক:  তকাল (৭ নবেম্বর) দিনভর সাধারণ মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলো প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ‘গণভবন’। কী আলোচনা হচ্ছে সেখানে? রাজনীতির বর্তমান অচলাবস্থা নিরসনে ইতিবাচক কী বার্তা ঘোষিত হবে সেখান থেকে? জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও সরকারের মধ্যেকার ছোট পরিসরের এই দ্বিতীয় দফার সংলাপই ছিলো গতকাল ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’। এর রেশ এখনো শেষ হয়নি।

জানা যায়, এই বৈঠকে ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তুলে ধরে। সংলাপের শুরুতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে চার দফা দাবিসংবলিত লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়। এতে ঐকমত্যের ভিত্তিতে একজন প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে ১১ জনের নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের কথা বলা হয়। কিন্তু প্রায় তিন ঘণ্টা আলোচনার পরও সংবিধান-সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো ছাড় দিতে সম্মত হয়নি সরকার পক্ষ। তবে রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের অন্যায়ভাবে হয়রানি ও গ্রেফতার না করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস মিলেছে বৈঠকে।

সংলাপে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘আগের সংলাপে এসে সাত দফা দাবি জানিয়েছিলাম, বিস্তারিত আলাপ করেছি। এবার এসেছি সমাধান সম্পর্কে জানতে।’

ঐক্যফ্রন্টের প্রস্তাবের বিপরীতে বক্তব্য দেওয়ার জন্য আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক শ. ম. রেজাউল করিমকে আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। রেজাউল করিম বলেন, সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার-ব্যবস্থাকে সংবিধানের সংগে সাংঘর্ষিক বলে রায় দেওয়া হয়েছে। ফলে নতুন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার-ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার আইনগত ও সাংবিধানিক ভিত্তি নেই। আমরা শুধু সমঝোতার স্বার্থে এমন সিদ্ধান্ত নিলেও কেউ যদি আদালতে রিট করে বলেন, এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার-ব্যবস্থা বেআইনি। তাহলে নতুন আইনি জটিলতা সৃষ্টি হবে। তখন যে সরকার নির্বাচিত হবে, সেটিও অবৈধ হয়ে যাবে।’

এ প্রসংগে বিএনপি নেতা মওদুদ আহমদ বলেন, ‘এভাবে বললে সমঝোতার পথ থাকে না। আমরা এখানে এসেছি সমঝোতার জন্য। এমন প্রশ্ন তুললে ১৯৯১ সালের নির্বাচনকালীন সরকার, ২০০৭-এর সরকার নিয়েও প্রশ্ন তোলা যায়।’ আ. স. ম. আবদুর রব বলেন, ‘সাংবিধানিক খুঁটিনাটি নিয়ে কথা বলতে নয়, সমঝোতার জন্য এখানে আসা। আগে একমত হতে হবে, সবাই সংকটের সমাধান চাই কি না।’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রেজাউল করিমের বক্তব্যের প্রসংগ টেনে বলেন, সমঝোতার ভিত্তিতে যে কিছু করবেন, তার সমাধান কোথায়?

এরপর আলোচনার ইস্যু বদলে যায়।

নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ সৃষ্টির লক্ষ্যে খালেদা জিয়ার মুক্তির প্রসংগে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সংবিধানের কোথায় আছে যে, সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে নির্বাহী বিভাগ খালাস দিতে পারে? আদালত নিজস্ব গতিতে চলবেন। সরকার এখানে কেউ না। এটা দুর্নীতি দমন কমিশনের বিষয়। তবে যদি আমাদের কিছু করণীয় থাকে, আমরা দেখবো।’

জবাবে আইনি ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে মওদুদ আহমদ বলেন, খালেদা জিয়ার জামিন হয়েছিলো। কিন্তু দেড় মাস ধরে নানান আইনি জটিলতা তৈরি করে তাঁর জামিন বাতিল করা হয়েছে। পরে তাঁর সাজার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়ায় জামিনের সুযোগ ছিলো। রাজনৈতিকভাবেই তাঁকে আটকে রাখা হয়েছে। তাই রাজনৈতিক বিবেচনায় তাঁর জামিনের ব্যবস্থা করা যায়।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, পহেলা সেপ্টেম্বরের পর কোনো সংঘাত-সহিংসতা হয়নি। এরপরও একেবারে অসত্য, গায়েবি ও ভুয়া মামলা হয়েছে। এ সময় প্রধানমন্ত্রী আটক-তালিকা চাইলে তা দেওয়া হয়। সংগে সংগে প্রধানমন্ত্রী তালিকাটি আইনমন্ত্রীকে দিয়ে ব্যবস্থা নিতে বলেন এবং রাজনৈতিক কারণে গ্রেফতার-হয়রানি করা হবে না বলে আশ্বাস দেন। তবে ব্যক্তিগত অপরাধের মামলা বিবেচনা করা হবে না বলে জানান তিনি। জবাবে মওদুদ বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে যদি কেউ হত্যা করে, ধর্ষণ করে, রাজনৈতিক নেতা হলেও আমরা সেটিকে রাজনৈতিক মামলা বলবো না। আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে।’

আলোচনার বিভিন্ন পর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে নানান বিষয়ে আলোচনা হয়। একে অনেকে রাজনৈতিক খুনসুঁটি বলেই মন্তব্য করেছেন। প্রধানমন্ত্রী ঐক্যফ্রন্ট নেতা জাফরুল্লাহ চৌধুরী’র ফাঁস হওয়া সাম্প্রতিক ফোনালাপ প্রসংগে বলেন, জাফরুল্লাহ চৌধুরী নারী নির্যাতনের ভুয়া মামলা করার এবং ৫০টি টিম গঠন করে বিভিন্ন রকম হামলার নির্দেশনা দিচ্ছেন; যাতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়। এটা রাজনৈতিক ঘটনা কি না, জানতে চান প্রধানমন্ত্রী। তখন ড. কামাল হোসেন জাফরুল্লাহ’র প্রসংগ উল্লেখ না করে বলেন, ‘আমরা কোনো অপরাধই সমর্থন করি না।’

আলোচনার এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মাহমুদুর রহমান মান্না আমার বিরুদ্ধে কী সাংঘাতিক বক্তৃতা দিলো।’ জবাবে মান্না বলেন, বক্তৃতা তো রাজনীতির অংশ। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আরো দাও, তুমি আরো বক্তৃতা দাও।’

প্রধানমন্ত্রী আ. স. ম. রবকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আপনি চৌমুহনী কলেজের ভিপি ছিলেন। আমি তখন ইডেন কলেজের ভিপি। আমরা সমসাময়িক। আমাদের সংগেও ছিলেন, মন্ত্রিত্ব পেয়েছেন। একেক সময় একেক কথা বলেন।’ অবশ্য এর জবাব দেননি আ. স. ম. রব।

সুলতান মোহাম্মদ মনসুর সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ভারতে গিয়েছিলে। প্রতিবাদ করেছিলে। তোমাকে এনে ডাকসু’র ভিপি করলাম। চলে গেলে রাজ্জাক ভাইয়ের সংগে বাকশাল করে আমার বিরুদ্ধে। আবার ছাত্রলীগের প্রেসিডেন্ট করলাম, এমপি বানালাম। তুমি বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাঘুরি করো, কিচ্ছু পাবে না, জীবনে কিছু হতে পারবা না।’

এস এম আকরামকে উদ্দেশ্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনি তো আওয়ামী লীগ করতেন। আজ ওই দিকে বসলেন কেন? এ সময় আকরাম বলেন, ‘আমি মান্না সাহেবের দলে আছি।’ তখন প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ও, আপনি দল পাল্টাইছেন। পাল্টান, খুব ভালো।’

মওদুদ আহমদকে উদ্দেশ্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনি এক-এগারোর সময় জেলে ছিলেন। আবারও জেলে যেতে চান?’ তখন মওদুদ আহমদ বলেন, ‘আমরা একটু স্পেস চাই।’ জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এমন কোনো স্পেস দেওয়া যাবে না যে, অন্ধকারের লোকেরা আবার আসতে পারে। অন্ধকারের লোকদের আমি আসতে দেবো না। আরেকটা জিনিস মনে রাখবেন, সহিংসতা করবেন না। সহিংসতা কীভাবে মোকাবিলা করতে হয়, সেটা কিন্তু ২০১৩-২০১৪ সালে দেখিয়েছি।’

এ পর্যায়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং মওদুদ আহমদের মধ্যে কিছুটা বাক্যবিনিময় হয়। মওদুদ বলেন, ‘আমি বাড়িতে গেছি, ঘর থেকে বের হতে দেওয়া হয় না।’ ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আপনি আমাকে লক্ষ্য করে বক্তৃতা করেছেন।’ মওদুদ বলেন, ‘আমি কারও নাম বলিনি। তাহলে উনি ধরে নিলেন কেন উনাকে বলছি?’ কিছুক্ষণ তর্কবিতর্কের পর প্রধানমন্ত্রী তাঁদের থামিয়ে দেন।

আলোচনার শেষ পর্যায়ে ঐক্যফ্রন্টের নেতারা বলেন, তাঁরা নির্বাচনের পক্ষে। তবে আরো আলোচনা হওয়া দরকার। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সময় আর নেই। এভাবে বসাবসি হবে না। তবে কোনো সমস্যা থাকলেই আইসেন, শুনবো।’ তখন কামাল হোসেন বলেন, ‘তফসিলটা একটু পিছিয়ে দেন।’ জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এটা আমার এখতিয়ার না। এছাড়া আমিও তফসিল পেছানোর পক্ষে না। পিছিয়ে দেওয়ার মাঝখানেই অন্ধকারের শক্তি। তৃতীয় শক্তি ক্ষমতায় আসতে চাইবে। তফসিল ঘোষণার পরও আলোচনা হতে পারে।’

নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের দাবি নাকচ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটা কোনোদিনই হবে না। যার হাতে অস্ত্র, তার হাতেই বিচারিক ক্ষমতা? তাহলে আর কী থাকবে? স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে সেনাবাহিনী থাকবে। বেসামরিক প্রশাসন যেভাবে নির্দেশনা দেবে, সেভাবে তারা কাজ করবে।

সংলাপ শেষে মওদুদ আহমদ ও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রধানমন্ত্রীর সংগে কিছু সময় আলাপ করেন। একপর্যায়ে ফখরুল ইসলাম জেলে থাকা দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সংগে সাক্ষাত করার বিষয় তোলেন। এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বাধা না দেওয়ার আহ্বান জানান। এতে প্রধানমন্ত্রী সায় দেন।

মওদুদ আহমদ তাঁর বাড়ি নিয়ে যাওয়ার প্রসংগ তোলেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাড়িটা নেওয়া হতো না। আপনি জালিয়াতি করতে গেলেন কেন?’ মওদুদ বলেন, আদালত বলেছেন বাড়ি সরকারের না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কিছু হতো না। বাড়িটা যদি আপনি জসীমউদ্দীনের মেয়ের নামে, হাসনা মওদুদের নামে লিখে দিতেন। কিন্তু আপনি নিয়ে আবার দিয়েছেন আপনার ভাইয়ের নামে।’ এ পর্যায়ে মওদুদ ঠাট্টার ছলে বলেন, ‘তাহলে আমি ওনার নামে (হাসনা মওদুদ) করে দেবো।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আর বিশ্বাস করা যায় না।’

আজ প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করবেন সন্ধ্যা সাতটায়। জাতির উদ্দেশে দেওয়া তাঁর এই ভাষণের পর রাজনীতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা দেখার জন্য অপেক্ষা ছাড়া গত্যন্তর নেই।

 

ভয়েস বাংলা/ওএফ

সম্পর্কিত

বীরপ্রতীক তারামন বিবি অসুস্থ

ডেস্ক রিপোর্ট

অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে জাতীয় নির্বাচনের তফসিল

ডেস্ক রিপোর্ট

অপশক্তির উসকাসিতে সাড়া দিও না: ওবায়দুল কাদের

ডেস্ক রিপোর্ট

ছাত্র আন্দোলনে অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করা হয়েছে: অাইজিপি

ডেস্ক রিপোর্ট

দেশে আরও চার মেডিকেল কলেজ হচ্ছে: নাসিম

ডেস্ক রিপোর্ট

বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছেই

ডেস্ক রিপোর্ট

মতামত