ইকবাল খান: প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে ভ্যাট বা কর বসানো হয়নি বলে জানালেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া। ১৩ জুন এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ‘ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর ভ্যাট বা কর বসানো হচ্ছে বলে যে অপপ্রচার করা হচ্ছে সেই তথ্য সঠিক নয়।’ বিষয়টি সম্পূর্ণ গুজব বলে জানান তিনি। সাত জুন জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেটে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থে সরকার ভ্যাট বাসাচ্ছে এমন গুজব ছড়ায়।

ফেসবুকে এক প্রবাসী তাঁর পোস্টে লিখেছেন, “যে প্রবাসীদের টাকায় বাংলাদেশ চলে সেই প্রবাসীদের এখন বাঁশ দিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। প্রবাসীরা যদি ব্যাংকে টাকা পাঠানো বন্ধ করে দেয় অচল হয়ে যাবে বাংলাদেশ। এই কথাটা বলা যদিও ঠিক না তারপরও বলতে বাধ্য হচ্ছি। বাংলাদেশিদের প্রতিবার টাকা পাঠাতে ১৫/২০ দিরহাম করে এক্সট্রা চার্জ দিতে হয়। অন্য দেশে সরকার চায় তার দেশের মানুষ বেশি করে টাকা পাঠাক, বেশি করে টাকা পাঠানোর জন্য তাঁদের উৎসাহ দেয়। আর আমাদের দেশের সরকার বলে মাসে ২১,০০০ টাকার বেশি পাঠালে ট্যাক্স দিতে হবে।

ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা পাঠানো ছাড়া অন্য রাস্তাও আমাদের জানা আছে। ঘরে গিয়ে দিয়ে আসবে টাকা, ব্যাংকে গিয়ে লাইনে দাঁড়াতে হবে না। সরকার যদি আমাদের সাথে এমন করে আমাদেরও বিকল্প রাস্তা ধরতে হবে। আমাদের টাকায় দেশ চলে আর আমাদের পিছনে বাঁশ দেয় সরকার। মন্ত্রীদের ৭৫ হাজার টাকা দামের মোবাইল দেয় সংগে মাসে ১৫ হাজার টাকা ব্যালেন্স। সকল প্রবাসীদের এক হয়ে তাঁর প্রতিবাদ করতে হবে ব্যাংকে টাকা পাঠানো বন্ধ করে দিতে হবে। সকল প্রবাসীকে এক হতে হবে। প্রবাসে যারা থাকে তাঁরা জানে টাকা কামানো কতো কষ্ট। এক হাজার দিরহাম বেতন হলে ৫০ দিরহাম এই দেশের সরকারকে ট্যাক্স দিতে হয়। আবার দেশে টাকা পাঠাতে গেলে ২০ দিরহাম চার্জ দিতে হয়। সব মিলিয়ে থাকে কতো? তার উপর যদি দেশের সরকার জুলুম করে তা মেনে নেওয়া যায় না।”

এমন আরো অনেক পোস্ট ভাইরাল হয়েছে ফেসবুকে। তবে, এনবিআর গণমাধ্যমে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরের বাজেটে বিদেশ থেকে পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট আরোপিত হয়েছে মর্মে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত হচ্ছে। এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও গুজব। দেশের বৈধ রেমিট্যান্স প্রবাহ বন্ধ করে হুন্ডির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানোর অপপ্রয়াস হিসেবে এই প্রচারণা চালানো হতে পারে বলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) মনে করে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, মূল্য সংযোজন কর আরোপিত হয় পণ্য বা সেবা সরবরাহের ওপর। বাংলাদেশের প্রবাসীরা দেশের বাইরে কঠোর শ্রমের মাধ্যমে যে সেবা দিয়ে থাকেন তার বিনিময়ে বৈদেশিক মুদ্রা আসে। এই কার্যক্রম মূল্য সংযোজন কর আইন- ১৯৯১-এর ধারা ৩-এর উপধারা ২(ক) মোতাবেক সেবা রফতানি হিসেবে বিবেচিত। সুতরাং এই রফতানি কার্যক্রম ভ্যাটের আওতা বহির্ভূত। অর্থাৎ রেমিট্যান্স সীমা নির্বিশেষে এই খাতের ওপর কোনো ভ্যাট প্রযোজ্য নয়। তাই প্রবাসীরা বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে যে কোনো পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বা রেমিট্যান্স পাঠাতে পারেন।

এ বিষয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমও তাঁর ফেসবুক পেজে লিখেছেন, “প্রবাসী ভাইয়েরা গুজবে কান দেবেন না। এই বাজেটে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের ওপর কোনো ভ্যাট বা ট্যাক্স আরোপ করা হয়নি। এ রকম কোনো আলোচনাও কোথাও হয়নি। পরিকল্পিতভাবে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এটা অবৈধ পথে যারা প্রবাসীদের আয় পাঠানোর ব্যবসা করেন তাঁদের কাজ হতে পারে, সেই সাথে সরকার বিরোধীরা তো রয়েছেই।”

স্পেনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেন,বাংলাদেশ সরকারের ২০১৮-২০১৯ অর্থ বছরের দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ বাজেটে প্রবাসীদের আয়ের উপর ভ্যাট বসানোর কথা কোনো জায়গায় উল্লেখ করেনি। এটি সম্পূর্ন মিথ্যা এবং বানোয়াট বলে নিশ্চিত করেন এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের এসকল ভূয়া নিউজ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইজবুক লাইভ এবং গুজবে কান না দেওয়ার আহবান করেন তিনি।

এই বিজ্ঞপ্তি ঘোষণার ফলে বিষয়টি নিয়ে প্রবাসীদের মাঝে যে ভীতি কাজ করছিলো তা অনেকটাই কেটে গেছে। মালয়েশিয়া প্রবাসী মাজহারুল ইসলাম ভয়েস বাংলাকে বলেন, প্রবাসী আয়ের উপর সরকারের ভ্যাট বা ট্যাক্স না বসানোর সিন্ধান্তে সাধুবাদ জানাই মালয়েশিয়া প্রবাসীদের পক্ষ থেকে। তবে, বিষয়টি এখনো অনেকে অবগত নয়। তাছাড়া ফেসবুকে গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় অনেকে এখনো আতংকিত। বিষয়টি প্রবাসীদের অবগত করতে ব্যাপক প্রচারণা দরকার বলেও মনে করেন তিনি। একইসংগে অপপ্রচার বন্ধে সরকারকে আরো কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান এই প্রবাসী।

অস্ট্রেলিয়ার প্রবাসী আবুল কালাম আজাদ বলেন, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে ভ্যাট বা কর না বসানোর সিদ্ধান্তে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাংলাদেশিদের পক্ষ থেকে সরকারকে সাধুবাদ জানান তিনি। তবে প্রবাসীদের অবগত করানোর জন্য সরকারের ব্যাপক প্রচারণা চালানো দরকার বলে জানান তিনি। না হলে প্রবাসীদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তি সহজে দূর হবে না।

এনবিআর-এর বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, অবৈধ চ্যানেল বা হুণ্ডির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা বা রেমিট্যান্স পাঠাতে হলে তা জাতীয় অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখতে পারে না। তাই হুণ্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠানো থেকে বিরত থাকার জন্য সবাইকে অনুরোধ করা হচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড হুণ্ডি বা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধের বিষয়ে সবসময় সতর্ক রয়েছে।