ইয়াসির ইয়ামীন: বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার ব্রিটিশ আইনজীবী লর্ড কার্লাইলকে দিল্লি বিমানবন্দর থেকেই ফেরত পাঠিয়েছেন দেশটির ইমিগ্রেশন কর্তারা।

এ প্রসংগে দিল্লি থেকে বিবিসি বাংলা’র সংবাদদাতা শুভজ্যোতি ঘোষ ব্রিটিশ আইনজীবী লর্ড কার্লাইলের মিডিয়া টিমের বরাত দিয়ে জানিয়েছেন, লর্ড কার্লাইল বুধবার (১১ জুলাই) গভীর রাতে দিল্লি বিমানবন্দরে এসে পৌঁছালে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা তাঁকে জানান, ভারত সরকার তাঁর ভিসা প্রত্যাহার করেছে। এরপর তাঁকে লন্ডনের ফিরতি ফ্লাইটে তুলে দেওয়া হয়।

আজ বৃহস্পতিবার (১২ জুলাই) দিল্লির পাঁচতারা হোটেল লা মেরিডিয়ানে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হতে চেয়েছিলেন কার্লাইল। এর আগে জানানো হয়েছিলো, সংবাদ সম্মেলনটি ১৩ জুলাই (শুক্রবার) দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব-এফসিসি-তে অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু একইদিন দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত এফসিসি-তে আসবেন- এই অজুহাতে কার্লাইলের বুকিং বাতিল করে ক্লাব কর্তৃপক্ষ। বাধ্য হয়েই লা মেরিডিয়ান হোটেলেই সংবাদ সম্মেলনের ভেন্যু নির্ধারণ করেন কার্লাইল। কিন্তু সেখানেও করা হলো না তাঁর সংবাদ সম্মেলন।

কার্লাইলের ভারত সফরের উদ্দেশ্য কী ছিলো?

জানা গেছে, বাংলাদেশে কারাবন্দী বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা কেন ‘সাজানো’ এবং ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’, কার্লাইল তা দিল্লির সংবাদ সম্মেলনে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছিলেন।

এর আগে, গত ২ জুলাই লর্ড কার্লাইল বিবিসিকে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ সরকার তাঁর ভিসার আবেদন ঝুলিয়ে রাখায় তিনি বাধ্য হয়ে দিল্লিতে গিয়ে সংবাদ সম্মেলন করছেন।’ তিনি বলেছেন, ‘আমি বেগম জিয়ার আইনজীবী টিমের একজন হিসেবে এই সম্মেলন ঢাকাতেই করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার আমাকে ভিসা প্রদানে বাধা সৃষ্টি করায় ঢাকার বদলে অনুষ্ঠানটি দিল্লিতেই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

এ সময় লর্ড কার্লাইল আরো বলেছেন, ‘আমি কোনো রাজনৈতিক প্রচারণায় শামিল হতে দিল্লি যাচ্ছি না। একজন সিনিয়র ব্রিটিশ আইনজীবী হিসেবে আমাকে এই মামলায় আমার মক্কেলের পক্ষে নিয়োজিত করা হয়েছে, সে কারণেই আমি এটা করছি। আমি বিশ্বাস করি, শুধু রাজনীতির কারণেই মামলাটি রুজু করা হয়েছে।’

যদিও ঢাকা থেকে বিএনপি’র সিনিয়র কিছু নেতা এবং খালেদা জিয়ার অন্য আইনজীবীদেরও লর্ড কার্লাইলের সংগে যোগ দেবার কথা ছিলো।

বিবিসি লর্ড কার্লাইলকে প্রশ্ন করেছিলো, আপনি কি বলতে চাইছেন, খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হতে হচ্ছে? জবাবে লর্ড কার্লাইল বলেছেন, ‘আমি প্রতিহিংসা শব্দটি ব্যবহার করতে চাই না, তবে এটুকু বলবো, খালেদা জিয়াকে সে দেশের আসন্ন নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে অবশ্যই একটা তীব্র রাজনৈতিক প্রচেষ্টা চলছে।’

ব্রিটিশ আইনজীবী লর্ড কার্লাইলের নাম বাংলাদেশে অনেকেই জানেন। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ২০১৬ সালের ৮ মার্চ জামায়াত নেতা মীর কাসিম আলীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মৃত্যুদণ্ডে রায় বহাল রাখার পর লর্ড কার্লাইল বাংলাদেশ সরকারের কাছে একটি চিঠি লিখেছিলেন। এতে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন এবং ঐ আদালতের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তার সুপারিশ করেছিলেন। তখন থেকেই কার্লাইলকে ঘিরে আলোচনা ও বিতর্কের সূচনা।

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ মহলের অভিমত, সম্ভবত এ কারণেই লর্ড কার্লাইল ভারতে বসে বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে কোনো রাজনৈতিক ক্যাম্পেইন চালান- ঢাকা সেটা পছন্দ করছে না বলে দিল্লিকে জানিয়েছে। এছাড়াও নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্রে জানা গেছে, লর্ড কার্লাইল দিল্লিতে আসছেন এ খবর জানাজানি হওয়ার পরই ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাই-কমিশন ভারতের কাছে আপত্তির কথা জানিয়েছে।

এমনকি, কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ. টি. ইমাম ভারত সফরকালে মোদী সরকারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম. জে. আকবর এবং বিজেপি’র শীর্ষ নেতা রাম মাধবের সংগে সাক্ষাত করেন। জনাব ইমাম তখন এ প্রসংগেও কথা বলেছেন বলে জানা গেছে।

সূত্র মতে, লর্ড কার্লাইলকে ভারতে সংবাদ সম্মেলন করতে না দেওয়ার বিষয়ে ঢাকা’র পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছে- লর্ড কার্লাইল খালেদা জিয়ার হয়ে মামলা লড়তে আর্থিকভাবে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। ফলে দিল্লিতে তিনি যেসব কথা বলতে যাচ্ছেন সেগুলো ‘পেইড পলিটিক্যাল ক্যাম্পেইনে’র অংশ, যার নিশানা হলো বাংলাদেশ সরকার।

ঢাকা’র পক্ষ থেকে এমন কথাও বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশ যেভাবে তাদের ভূখন্ডকে ভারত-বিরোধী কার্যকলাপের জন্য ব্যবহৃত হতে দেয় না, সেভাবে ভারতেরও উচিত নয় দিল্লির মাটিকে বাংলাদেশ-বিরোধী প্রচারের জন্য ব্যবহৃত হতে দেওয়া।

এসব যুক্তি-পাল্টা যুক্তির কারণেই হয়তো ভারত সরকার কার্লাইলকে দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন করা তো দূরের কথা, বিমানবন্দরের চৌকাঠই পার হতে দেয়নি। যার সূত্র ধরে কেউ কেউ বলছেন, বিএনপি যতোই চেষ্টা করুক, ভারত-বিরোধিতার চাদর খুলে ফেলতে, সেই দিল্লি প্রকৃতই বহুদূর..।

প্রাসংগিক কারণেই এখানে বিএনপি প্রতিনিধি দলের সাম্প্রতিক ভারত সফর নিয়েও আলোচনা হতে পারে। সবাই জানেন, গত মাসে দিল্লি সফর করে ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও থিংকট্যাঙ্কের সংগে মতবিনিময় করেছে বিএনপি’র তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল। এই সফরের মধ্যে দিয়ে বিএনপি ভারত সম্পর্কে তাদের মনোভাব বদলাতে চাইছে, এমনই একটি বার্তা দিতে চেয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন।

কিন্তু এর ফলাফল প্রত্যক্ষ করার আগেই সফরের পরপর এক সাংবাদিক সম্মেলনে আবারো ভারত-বিরোধী ঝান্ডা তুলে ধরেন বিএনপি’র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। ঢাকায় ভারতীয় হাই-কমিশনকে তীব্র আক্রমণ করে রিজভী বলেন, ‘সরকারকে টিকিয়ে রাখতে ভারতীয় হাই-কমিশনের কর্মকর্তারা ঔপনিবেশিক শাসকের ভূমিকা নিয়েছেন।’ ঢাকায় ভারতীয় হাই-কমিশন দফতরকে ব্রিটিশ আমলের ‘গবর্নর হাউস’ আখ্যা দিয়ে রিজভী বলেন, ‘বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তারা আগ্রাসী হস্তক্ষেপ করছে, যা দুঃখজনক।’ রিজভী আরো বলেন, ‘ভারত কার্লাইলকে ভিসা না দিলে প্রমাণ হবে, বেগম জিয়াকে জেলে ঢোকানোর ক্ষেত্রে এই হাই-কমিশনের নেপথ্য ভূমিকা রয়েছে।’ ভারতীয় হাই-কমিশনকে শাসক দল আওয়ামী লীগের মুখপাত্র বলেও তিনি ঘুরিয়ে মন্তব্য করেন।

অবশ্য রিজভী’র ভারত-বিরোধী মন্তব্যের দায়ভার নেননি দলের কেউ। বরং দলের স্থায়ী কমিটির এক নেতা বলেছেন, ‘এই মন্তব্য রিজভী’র ব্যক্তিগত। দলের নেতৃত্ব তাঁর সংগে একমত নন।’ এর পরে বিকালেই আবার সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে নরম সুরে রিজভী বলেছেন, ‘একাত্তরে স্বাধীনতার যুদ্ধে ভারত যেভাবে পাশে থেকেছে, আমি আশা করি সুষ্ঠু নির্বাচনের পথেও বাংলাদেশকে সেভাবে তারা সাহায্য করবে। প্রতিবেশীদের সংগে সুসম্পর্কে বিশ্বাসী বিএনপি।’

প্রসংগত, চলতি বছরের মার্চে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে চলমান মামলায় আইনগত পরামর্শ দেওয়ার জন্য লর্ড কার্লাইলকে নিযুক্ত করে বিএনপি। তখন ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘খালেদা জিয়ার মামলায় আইনগত পরামর্শ দেওয়ার জন্য লর্ড কার্লাইলকে অনুরোধ করা হলে তিনি সম্মতি জানিয়েছেন।’ বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদও তখন বলেছেন, ‘লর্ড কার্লাইলের ভূমিকা হবে মূলতঃ একজন আইনি পরামর্শকের।’

রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠছে, একজন আইনি পরামর্শক অন্য একটি দেশে গিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে মামলার বিষয়ে কী পরামর্শ দিতে চান? এটি কতোটা সংগত? আদৌ এটি তাঁর এখতিয়ারে পড়ে কি না? নাকি পুরো বিষয়টিই রাজনৈতিক কৌশল ও অপপ্রচারের অংশ; যেটি সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে?