তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী, জুনাইদ আহমেদ পলক (এমপি): বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে আরেকটি চমৎকার স্বপ্নের সফল বাস্তবায়ন হলো। ১৯৭৫ সালের ১৪ জুন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গাজীপুরের বেতবুনিয়ায় কৃত্রিম ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র স্থাপনের মধ্য দিয়ে স্বপ্নের যে বীজ বপন করেছিলেন সে পথ ধরেই বাংলাদেশ আজ নিজস্ব স্যাটেলাইটের মালিক হলো। বিশ্বের প্রায় দু’শত দেশের মধ্যে মাত্র ৫৬টি দেশ মহাকাশে নিজস্ব স্যাটেলাইট স্থাপনের অভিজাত ক্লাবের সদস্য। আর বাংলাদেশ এ ক্লাবের ৫৭তম সংযোজন। এ স্যাটেলাইট বিশ্বে বাংলাদেশকে নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়। শুধু তাই নয়, সঠিক ব্যবহার ও বিপণনের মাধ্যমে আমাদের অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার পথ প্রশস্ত করেছে এ স্যাটেলাইট। ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের পথকে করেছে আরো মসৃণ।

মহাকাশে বিভিন্ন ধরনের উপগ্রহ রয়েছে। যেমন: ভূ-স্থির যোগাযোগ উপগ্রহ, পৃথিবী পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা উপগ্রহ, মহাকাশ পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা উপগ্রহ, প্রযুক্তি উন্নয়ন উপগ্রহ, অবস্থান নির্ণয় উপগ্রহ, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা উপগ্রহ ইত্যাদি। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ একটি ভূ-স্থির যোগাযোগ (Geostationary Communication) স্যাটেলাইট। এ থেকে মূলত তিন ধরনের সেবা পাওয়া যাবে- এক. সম্প্রচার, দুই. টেলিযোগাযোগ, তিন. ডাটা কমিউনিকেশনস। দর্শক ও শ্রোতাদের কাছে সরাসরি পৌঁছাতে রেডিও ও টেলিভিশন স্টেশনগুলো ব্রডকাস্টিং সেবা ব্যবহার করে থাকে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ ব্যবহার করে কম খরচে আরো বেশি সংখ্যক টেলিভিশন চ্যানেল দেখা যাবে। ভালো মানের ভিডিও দেখা যাবে। বর্তমানে দেশের প্রায় ৩০টি টিভি চ্যানেল সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশের মালিকানাধীন স্যাটেলাইটের ওপর নির্ভরশীল। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ দেশীয় চ্যানেলগুলোর বিদেশ নির্ভরতা কমাবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় করবে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানো ছাড়াও বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ দিয়ে বিদেশি টিভি চ্যানেলগুলো তাঁদের দর্শক-শ্রোতাদের সেবা প্রদানের সুযোগ করে দিতে পারে। স্যাটেলাইটটিতে ৪০টি ট্রান্সপন্ডার আছে। যা থেকে ১৬শ’ মেগাহার্টজ ফ্রিকোয়েন্সি পাওয়া যাবে এবং এর অর্ধেক অর্থাৎ ২০টি ট্রান্সপন্ডারের ৮শ’ মেগাহার্টজ নিজেদের ব্যবহারের জন্য রেখে বাকিটা বিদেশি চ্যানেলগুলোর সেবা প্রদানের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা যাবে।

সাধারণভাবে ইন্টারনেট সেবা সরবরাহকারী (আইএসপি) প্রতিষ্ঠানগুলো ইন্টারনেট সেবা দিতে এবং মোবাইল ফোন অপারেটররা তাঁদের ব্যাকহল ট্রান্সমিশনের জন্য অপটিক্যাল ফাইবার সংযোগ ব্যবহার করে থাকে। তবে দুর্গম এলাকা এবং আপদকালীন বিকল্প হিসেবে স্যাটেলাইট অত্যাবশ্যকীয়।

ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের লক্ষ্য পূরণে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১কে অত্যন্ত কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাবে। সরকার ডিজিটাল বিভাজন নিরসন করে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছে। এজন্য সব অঞ্চলের জন্য ইন্টারনেটভিত্তিক তথ্যপ্রযুক্তির সমান সুবিধা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ইনফো সরকার-৩ প্রকল্পের মাধ্যমে ২০১৮ সালের মধ্যে দেশের সকল ইউনিয়নকে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট কানেক্টিভিটির আওতায় নিয়ে আসা এ উদ্যোগের লক্ষ্য। কিন্তু এসব ইউনিয়নের মধ্যে ৭৫০টি ইউনিয়ন দুর্গম এলাকায়। সাধারণত ডাটা সার্ভিসের জন্য অপটিক্যাল ফাইবারকে পছন্দের শীর্ষে রাখা হয়। তবে দুর্গম এলাকা বিশেষ করে দ্বীপ এবং পার্বত্য অঞ্চলে অপটিক্যাল ফাইবার কেবল লাইন পৌঁছানো দুরূহ ও ব্যয়বহুল। সেখানে ইন্টারনেট লিঙ্কড যোগাযোগ ও ডাটা সার্ভিসের বিকল্প উপায় হবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১। এছাড়াও জরুরী ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে ভূমিভিত্তিক যোগাযোগ সেবায় বিঘ্ন ঘটলে ডাটা ও টেলিযোগাযোগ সেবার ক্ষেত্রে স্যাটেলাইট থেকে বাড়তি সুবিধা নেয়া যাবে।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ আমাদের দূরদর্শী নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় প্রত্যয়জনিত সময়োপযোগী একটি উদ্যোগ। ২০২১ সাল নাগাদ তিনি ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে কাজ করে যাচ্ছেন। জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির পদযাত্রায় তাঁকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন, অত্যন্ত দক্ষ ও সুযোগ্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়, যিনি বাংলাদেশে একটি প্রযুক্তি ভিত্তিক রূপান্তরকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

বাংলাদেশ এরইমধ্যে একটি নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে বিশ্বব্যাংক কর্তৃক স্বীকৃতি লাভ করেছে এবং ইতিমধ্যে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়ার জন্য নির্ধারিত তিনটি মানদণ্ডই পূরণ করেছে। আমি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তাঁর উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের দূরদর্শী নেতৃত্বে ২০৪১ সাল নাগাদ বাংলাদেশ উন্নত দেশে পরিণত হবে। একথা গর্বভরে বলা যায় যে, দেশের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১। ভবিষ্যতে আরো সফলতা অর্জনের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবেও বিবেচিত হবে।

এ প্রকল্পের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রকৗশলীরা যে জ্ঞান অর্জন করছেন এবং ভবিষ্যতে করবেন তা আমাদের অমূল্য সম্পদ। আমরা আশা করতে পারি, সে দিনটি বেশি দূরে নয়, যেদিন আমাদের বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরা আমাদের নিজস্ব স্যাটেলাইট তৈরি করতে সক্ষম হবেন এবং দেশের মাটিতেই তা তৈরি হবে।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ সব সময় আমাদের প্রথম স্যাটেলাইট হিসেবেই বিবেচিত হবে। কিন্তু আমরা নিশ্চিত যে, এটি কোনভাবেই আমাদের শেষ স্যাটেলাইট হবে না। আমাদের আশা, সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশের উৎক্ষেপিত স্যাটেলাইট সিরিজে যুক্ত হবে নতুন এবং ভিন্নধর্মী আরো অনেক স্যাটেলাইট।

মহাকাশ ভ্রমণের প্রেরণাময়ী কাহিনী বিশেষ করে নভোচারী নীল আর্মস্ট্রং-এর চন্দ্রাভিযান আমাদের স্কুলগুলোতে পড়ানো হয়। বিষয়টি এখনও বিস্ময় জাগায় আর মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের শিশুদের আরো বড় পরিসরে ভাবতে উৎসাহ জোগায়। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ আমাদের পরের প্রজন্মকে ভবিষ্যতে সফল নভোচারী ও মহাকাশ বিজ্ঞানী হতে নিরন্তর অনুপ্রেরণা জোগাবে।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ নির্মাণ ও উৎক্ষেপণের ক্ষেত্রে থ্যালেস আলেনিয়া ও স্পেসএক্সের অসাধারণ দক্ষতাপূর্ণ কাজের জন্য তাদের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। এছাড়া রাশিয়ার স্পুটনিকের কাছ থেকে আমরা একটি সুবিধাজনক স্থানে (১১৯.১-পূর্ব দ্রাঘিমা) স্যাটেলাইট স্থাপনের নিমিত্ত স্লট লিজ নিয়েছি। আমাদের সর্বপ্রথম স্যাটেলাইটের সংগে তাদের নাম এবং অবদানও ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

সবশেষে এই স্যাটেলাইটটি যে মহান মানুষের নামে নামকরণ করা হয়েছে আমি তাঁকে গভীর শ্রদ্ধার সংগে স্মরণ করতে চাই। তিনি হলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সর্বপ্রথম স্যাটেলাইট আর্থ স্টেশন স্থাপনের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশকে মহাকাশ জগতে প্রবেশ করান এবং তাঁর দূরদর্শী সিদ্ধান্তে ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ সংস্থা (আইটিইউ)-এর সদস্য পদ লাভ করে যাঁর মাধ্যমে মহাকাশে আজ নিজস্ব স্যাটেলাইট প্রেরণ করা সম্ভব হলো। প্রায় এক দশক আগে বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি ও স্বপ্ন নিয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশ শুরু হয়েছিলো। সর্বপ্রথম স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের মাধ্যমে আরো একটি স্বপ্নপূরণের পাশাপাশি একটি প্রতিশ্রুতির সার্থক বাস্তবায়ন হলো। শেখ হাসিনার বিস্ময় জাগানিয়া উন্নয়ন অভিযাত্রা বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মতোই দুর্বার গতি অব্যাহতভাবে এগিয়ে চলুক সে প্রত্যাশা করছি।

সূত্র- দৈনিক জনকণ্ঠ