বিষয়টা ছোট। কিন্তু যন্ত্রণা অনেক। মনে করেন মশা, জোঁক, সাপ বা কীটপতঙ্গরা ছোট করে কামড় দেয়। কিন্তু তাদের কামড়ের যন্ত্রণা কিন্তু কখনো কখনো ভয়ঙ্কর। কখনো কখনো প্রাণও চলে যেতে পারে। সরকারি মন্ত্রী ও সচিবদের মোবাইল কেনার জন্য ৭৫ হাজার করে টাকা দেয়া হবে বলে মন্ত্রিসভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। টাকার অংকটা খুবই কম। এটা কি বছরে একবারই দেওয়া হবে, নাকি প্রতি বছর দেওয়া হবে, হাত থেকে পড়ে ভেঙে গেলে কী হবে, এখন কি তারা ভালো মোবাইল কিনতে পারছেন না? এসব বিষয় পরিষ্কার হয়নি। কিন্তু মন্ত্রী- সচিবদের মোবাইল কিনতে টাকা দেওয়া হবে- এই খবর সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে গেছে।

ভাইরাল হওয়া এই খবরের প্রতিক্রিয়া নেতিবাচক। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিরূপ মন্তব্য করা হয়েছে। নানান রকম তিরস্কার-টিপ্পনী কাটা হয়েছে। বলা হয়েছে, তাঁদের কি টাকার অভাব পড়েছে? আর কতো সুবিধা তাঁরা নেবেন। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় মোবাইল কেনা অনৈতিক। আরো নানান বিরূপ মন্তব্য। এমনকি, সরকারের যারা শুভাকাঙ্ক্ষী তাঁরাও এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। সামাজিক মাধ্যমে নানান প্রতিক্রিয়ার পর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের একটি জবাব চোখে পড়েছে। তিনি বলেছেন, ‘বুঝলাম না। ৭৫,০০০ টাকার মোবাইল ফোনের চেয়েও অনেক বড় সুবিধা নেননি এরকম মন্ত্রী আছেন। সেগুলো কেউ বলে না। বিশ্বাস করুন, মন্ত্রিসভায় এ রকম সদস্য আছেন, যারা স্মার্ট ফোন ব্যবহার করেন না, কারণ সেটা কেনার সামর্থ্য তাঁর নেই। টেলিফোন এবং তার বিল মন্ত্রীদের সরকার দেয় অনেক আগে থেকেই, এটা নতুন কিছু তো না। সর্বশেষ মডেলের আই ফোন বা স্যামসং ফোনের দাম কিন্তু ৭৫,০০০ টাকার অনেক বেশি!

এই নীতিমালা আজকে এসেছে অন্য কারণে, বিষয়টা কিন্তু উল্লেখ্ করা হয়নি’। সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টি মোবাইল বিষয়ে যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন তার জবাবে প্রতিমন্ত্রী এ কথা বলেছেন। এর উত্তরে মাসুদা ভাট্টি বলেছেন,খুউব ভালো লাগলো জেনে শাহরিয়ার। সবাইকে বলা হয়নি। কিন্তু ভোটের রাজনীতিতে এটা ইস্যু হবেই এবং এটা সেই বছরও। নয় বছর ফোন ছাড়া চললে এ বছর কেন কিনতে হবে? আমার জিজ্ঞাসা সেখানেই। মাসুদা ভাট্টি সরকারের একজন বড় শুভাকাঙ্ক্ষী, এতে কোনে সন্দেহ নেই। তিনি যথার্থ বলেছেন। সামনে নির্বাচন। এখন সাবধানে পা ফেলতে হয়। কখনো কখনো পচা শামুকেও পা কাটে। এজন্য এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত নয়, যাতে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। সমালোচনা হয়। প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক শক্তি সুযোগ নিতে পারে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।

জনমনে একটি ধারণা প্রতিষ্ঠিত, আমাদের মন্ত্রী-সচিবরা সমাজের একটি সুবিধাভোগী শ্রেণী। তাঁরা নানান সুযোগ- সুবিধা পান ন্যায়-অন্যায়ভাবে। এ কারণে তাঁদেরকে মোবাইল দেয়ার মতো সিদ্ধান্ত গণমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ায়, তার পক্ষে জনসমর্থন পাওয়া যায়নি। প্রতিমন্ত্রী ঠিকই বলেছেন, মন্ত্রিসভায় এমন কোনো কোনো মন্ত্রী আছেন, যারা খুবই সাধারণ। স্মার্ট ফোন কেনার সামর্থ্য নেই। আবার হয়তো এই ফোন চালাতেও তাঁরা অভ্যস্ত নন। এমন হয়তো সচিবও থাকতে পারেন। তাহলেও প্রশ্ন থাকে, যাঁরা স্মার্ট ফোনে অভ্যস্ত নন, তাঁরা ৭৫ হাজার টাকায় মোবাইল কিনে কী করবেন? তাঁরা যদি ব্যবহার না করেন তাহলে কি টাকা নেবেন না? যদি মোবাইল কিনে অন্য কাউকে দিয়ে দেন, তাহলেও তো আইন অমান্য হবে।

এসবই ছোট ছোট বিষয়। অনেক বড় বড় ঘটনার খবর নেই। ছোটখাটো বিষয় নিয়ে মাতামাতি করতে গিয়ে এমন কথা বলাই যায়। কিন্তু কথা হচ্ছে, এমন কী জরুরি বিষয় হয়ে গেলো যে মন্ত্রী- সচিবদের মোবাইল ফোন দেয়ার প্রস্তাব সামনে আনতে হবে। এরপর দেখা যাবে, সংসদ সদস্যরাও আবদার করে বসবেন, তাঁদেরও মোবাইল দিতে হবে অথবা ট্যাক্স ফ্রি গাড়ির মতো ট্যাক্স ফ্রি মোবাইল ইচ্ছামতো আনার সুযোগ দিতে হবে। কারণ, পদমর্যাদায় তাঁরা তো সচিবদের উপরেই আছেন। নির্বাচনী বছরে গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজ বাদ দিয়ে এখন মোবাইল কালচার ভালো কোনো লক্ষণ নয়।

মোস্তফা ফিরোজ: হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন।