12 C
Dhaka
৩ ডিসেম্বর, সোমবার , ২০১৮ ০৮:৫৭:৪৮ পূর্বাহ্ণ
ভয়েস বাংলা
মতামত

বিরাট বনাম শচীন: কোন্ ভগবান বড়?

ইয়াসির ইয়ামীন: বলা হয়, ইন্ডিয়ানরা ক্রিকেট খায়, ক্রিকেট পরে, ক্রিকেট ঘুমায়, ক্রিকেট …। এক কথায় ক্রিকেটই তাদের ধ্যান-জ্ঞান। বড় বড় টুর্নামেন্টের আগে-পরে বিষয়টি খুব ভালোভাবে বুঝা যায়। দীর্ঘ চার বছর পর ইংল্যান্ডে টেস্ট সিরিজ খেলতে ইন্ডিয়ান টিম এখন সফরে রয়েছে। ইতিমধ্যে এজবাস্টনে প্রথম টেস্ট ‘ব্যাপকভাবে’ (৩১ রানে) হেরেছে ‘টিম ইন্ডিয়া’। এই টেস্ট খেলতে যাবার আগে থেকেই ইন্ডিয়ান মিডিয়ায় কতো ঝড় যে উঠেছে, তার ইয়ত্তা নেই। ইন্ডিয়ান টিমে খেলতেন একসময়, এখন শুধু ‘কথায়’ খেলেন এমন বিশেষজ্ঞদের বকবক শুনতে শুনতে ভেবেছিলাম, ‘টিম ইংল্যান্ড’ হয়তো ভয়ে ঘটি-বাটিসহ মুল্লুক ছেড়ে পালাবে। কিন্তু বিধিবাম! সহজ টার্গেটও যখন আয়ত্তে আনতে পারলো না ‘টিম ইন্ডিয়া’ তখন শুরু হলো অন্য ঘ্যানর ঘ্যানর। বিরাট একা কী করবে, দলের অন্যরা তো ইংল্যান্ডে বেড়াতে এসেছে, ইত্যাদি ইত্যাদি।

সফর শুরুর আগেই আলোচনা উসকে দিয়েছিলো ইন্ডিয়ান মিডিয়া- বিরাট কি এবার শচীনের ‘অমুক’ রেকর্ড ভেঙে দেবে? ইংল্যান্ড বিজয় কি আসবে বিরাটের হাত ধরে? ক্রিকেট বিশ্বে কে বড়- শচীন না বিরাট? ব্লা-ব্লা …

এটা তো জানা কথাই যে, ইন্ডিয়ান ক্রিকেটে ভগবানের শেষ নেই। দেবতারও কমতি নেই। প্রশ্ন কেবল, কোন দেবতা কার চেয়ে বড়? আসুন, ইন্ডিয়ান ক্রিকেটের দুই মহান দেবতা ‘বিরাট’ ও ‘শচীন’-এর কিছু পরিসংখ্যান উল্টে-পাল্টে দেখি।

টেস্ট ও ওয়ান ডে- দুই ধারার ক্রিকেটে এই মুহূর্তে বিরাট কোহলি বিশ্বের এক নম্বর ব্যাটসম্যান। গত কিছুদিন ধরে ওয়ান ডে র‌্যাংকিংয়ে এক নম্বরে ছিলেন। ৫ আগস্ট প্রকাশিত আইসিসি’র টেস্ট র‌্যাংকিংয়েও সর্বশীর্ষে উঠে এলেন বিরাট। সাত বছর আগে দুই ধারার ক্রিকেটে এক নম্বরে ছিলেন শচীন টেন্ডুলকার। অর্থাৎ ফলাফল দাঁড়ালো, শচীনের গড়া মাইলফলক স্পর্শ করলেন বিরাট কোহলি।

এজবাস্টন টেস্টের প্রথম ইনিংসে অসাধারণ ১৪৯ রানের ইনিংস খেলে টেস্ট ক্রিকেটে দ্রুততম ২২তম সেঞ্চুরি করার প্রথম পাঁচের তালিকায়ও নিজের নাম লিখিয়েছেন বিরাট। সংগে ভেঙেছেন শচীনের রেকর্ডও। লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, বিরাট ২২টির মধ্যে ১২টি টেস্ট সেঞ্চুরিই করেছেন বিদেশে।

বিরাট ও শচীনের মধ্যে কে বড় ব্যাটসম্যান- সোস্যাল মিডিয়ায়ও এ নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। বিতর্কটি অহেতুক। ভারতীয় এক সাংবাদিকের লেখা পড়ছিলাম। বিরক্তি প্রকাশ করে তিনি লিখেছেন, বিয়র্ন বার্গের সংগে যেমন পিট সাম্প্রাসের তুলনা হয় না, পিট সাম্প্রাসের সংগে যেমন রজার ফেদেরারের তুলনা করা চলে না, তেমনি দুই সময়ের দুই সেরা ব্যাটসম্যানের মধ্যেও তুলনা করে লাভ নেই।

সত্যিই তো। এখন সময় পাল্টেছে। এর সংগে পরিবেশ, পরিস্থিতি, প্রতিপক্ষ বোলার, উইকেটের চরিত্র- সবই বদলেছে। তাই এসব তুলনা করে কী লাভ? আমি ক্রিকেটবোদ্ধা নই; তবু আমার নজরে ধরা পড়ছে, ক্রিকেটের আগ্রাসন, তীব্রতা, প্রতিযোগিতার ধরণ, বিতর্ক, নিয়ম-কানুন, নজরদারি এখন আগের তুলনায় বেড়েছে। তাহলে দুই প্রেক্ষাপটের দু’জন খেলোয়াড়কে নিয়ে সমান বিশ্লেষণ হয় কীভাবে?

শচীন তাঁর সময়ে গ্লেন ম্যাকগ্রা’র মতো পেসার সামলেছেন, খেলেছেন শেন ওয়ার্ন, সাকলাইন, মুত্তিয়া মুরলীধরনের মতো স্পিনারদের। মোকাবিলা করেছেন ওয়াসিম আকরাম, ওয়াকার ইউনুস, ইমরান খান, আবদুল কাদিরের বোলিং আক্রমণ। বিরাট খেলছেন এই সময়ের এন্ডারসন, বেন স্টোকসের মতো বোলারদের। তাই তুলনা না খুঁজে বিরাটের মতো বিশ্বসেরা ব্যাটসম্যানকে তাঁর প্রাপ্য মর্যাদাটুকু দেওয়াই সংগত।

প্রত্যেক অধিনায়কেরই নিজস্ব একটা স্টাইল থাকে। কোহলিরও আছে। শচীন টেন্ডুলকার ভারতীয় দলের অধিনায়ক ছিলেন। কিন্তু দেখা গেছে, শচীন অধিনায়কত্বের চাপ সেভাবে সামলাতে পারেননি। তাঁকে সবসময় নিজের ব্যাটিংয়ে মনোযোগী মনে হয়েছে। চারপাশে কী হচ্ছে, কে কী পারফর্ম করছে বা বলছে, সেদিকে তাঁর মনোযোগ ছিলো খুব কম।

পক্ষান্তরে বিরাট কোহলি? খুব উৎসাহী ও তীক্ষè দৃষ্টিসম্পন্ন। দলের নেতৃত্ব ও নিজের পারফরম্যান্স- দু’টোই সমানতালে চালিয়ে যাচ্ছেন। শুধু কি তাই? ক্রিকেটের বাইরের জীবনটাও সমানভাবে উপভোগ করছেন। বিরাট-আনুশকা ওরফে ‘বিরুশ্কা’ প্রেমের রসায়নও তো মিশিয়ে নিয়েছেন ক্রিকেটের সংগে। ক’জনের এমন ক্ষমতা আছে?

বলা হয়, শচীনকে বোলাররা সমীহ করতেন। বিরাটকে নাকি অনেকে ভয় পান। একই কথা প্রচলিত ক্যারিবীয় গ্রেট ভিভিয়ান রিচার্ডস সম্পর্কেও। অনেকের মতে, অধিনায়ক সৌরভ, ব্যাটসম্যান শচীন ও ভিভের মিশ্রণ হলেন বিরাট কোহালি। বয়স কেবল ২৮। আরো সাত-আট বছর অনায়াসে ক্রিকেট দুনিয়া মাতাবেন। কতো নজির, বেশুমার মাইলফলক গড়বেন, কে জানে! শচীনের একশো সেঞ্চুরির নজিরও হয়তো ভেঙে দেবেন একদিন। এজবাস্টনে ৫৭তম সেঞ্চুরি করলেন বিরাট। শচীনকে ছুঁতে বাকি মাত্র ৪৩টি সেঞ্চুরি। তাঁর অসাধারণ ফিটনেস নিয়েও কথা হয়। বলা হয়, কপিলদেব ছাড়া অন্য কোনো ভারতীয় অধিনায়কই এতোটা ফিট ছিলেন না।

ইংল্যান্ড অধিনায়ক ২৭ বছর বয়েসি জো রুট তৃতীয় সর্বকনিষ্ঠ ক্রিকেটার হিসেবে টেস্টে ৬,০০০ রান পূর্ণ করেছেন। তাঁর চেয়ে কম বয়সে এই মাইলফলকে পৌঁছেছেন শচীন এবং অ্যালিয়েস্টার কুক। শচীন ইংল্যান্ডে ১৭টি টেস্ট খেলেছেন। ৫৪.৩১ গড়ে রান করেছেন ১,৫৭৫টি। করেছেন ৪টি শতক ও ৮টি অর্ধশতক। লিডসে ২০০২ সালে মাত্র ৭ রানের জন্য দ্বি-শতক হাতছাড়া হয়েছে তাঁর।

অধিনায়ক হিসেবে টেস্টে দ্রুততম ৭,০০০ রানের রেকর্ড গড়েছেন বিরাট কোহলি। টেস্ট ক্রিকেটে এতোদিন দ্রুততম ৭,০০০ রানের রেকর্ড ছিলো ক্যারিবীয় কিংবদন্তি ব্রায়ান লারা’র দখলে। ১৬৪ ইনিংসে ৭,০০০ রান করেছিলেন লারা। বিরাট করলেন ১২৪ ইনিংসেই।

অর্ধশত রানকে শতকে উন্নীত করার ক্ষেত্রেও নজির গড়েছেন বিরাট কোহলি। টেস্টে ৫৭.৮৯ শতাংশ ইনিংসে ৫০ পেরোলেই বিরাটের ইনিংস শতকে পৌঁছেছে। এই তালিকায় তাঁর সামনে শুধু স্যার ডন ব্র্যাডম্যান। এজবাস্টনে মাত্র ১ রানের জন্য দেড়শো করতে পারেননি বিরাট। টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে বিরাট ছয় নম্বর অধিনায়ক, যিনি এক রানের জন্য দেড়শো করতে পারলেন না।

এজবাস্টন টেস্টে বিরাট রান করেছেন ১৪৯ ও ৫১। বাকি ব্যাটসম্যানদের অবস্থা কতোটা করুণ তা স্কোরবোর্ডের দিকে তাকালেই স্পষ্ট হচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছে, সাম্প্রতিক অতীতে দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে বিরাট যা রান করেছেন, অন্যরা এর অর্ধেকও করতে পারেননি। ২০১৭-২০১৮-তে বিরাট খেলেছেন ৭টি টেস্ট। এই ৭ টেস্টে ভারতের স্কোরবোর্ডে যতো রান উঠেছে, তার ৫৪.৪৮ শতাংশ রান একা বিরাট করেছেন।

এছাড়া অধিনায়ক হিসেবে ইংল্যান্ডে ভারতকে নেতৃত্ব দিয়ে প্রথম ইনিংসে ৫০-এর বেশি রান করে বিরাট কোহলি স্পর্শ করেছেন বিজয় হাজারে (৮৯, ১,৯৫২), পতৌদি জুনিয়র (৬৪, ১,৯৬৭), অজিত ওয়াদেকার (৮৫, ১,৯৭১) ও মহম্মদ আজহারউদ্দিনকে (১২১, ১,৯৯০)। তবে ১৪৯ রান করে চার সাবেক ভারতীয় অধিনায়ককেই টপকে গেছেন কোহলি।

যে যাই বলুন না কেন, বিরাট কোহলি এক দুর্দান্ত ব্যাটিং বরপুত্রের নাম। এজবাস্টন টেস্টে যেভাবে একা বুক চিতিয়ে লড়াই করলেন, তারপরও এ নিয়ে কথা বলে সময় নষ্ট করা উচিত নয়। ২০১৪ সালেও অ্যাডিলেডে তাঁর লড়াই ছিলো মনে রাখার মতো। যদিও দুই ইনিংসেই বিরাটের সেঞ্চুরি সত্ত্বেও দল জেতেনি সতীর্থদের ব্যর্থতায়। পক্ষান্তরে শচীন টেন্ডুলকারও এক মহান উইলোশিল্পী। ক্যারিয়ারে কতো চমকই না দেখিয়েছেন। গড়েছেন অসংখ্য রেকর্ড। কিন্তু কিছু কিছু নির্দিষ্ট দিনে গোটা ভারতবাসী উপবাস কাটালেও ব্যাটে তার প্রতিদান দিতে পারেননি। এমন ঘটনা একটি-দু’টি নয়, অসংখ্য। এ কারণেই ‘শচীন-অন্ধরা’ বাদে কম-বেশি সবাই বলেন, শচীন প্রয়োজনের সময় দল জেতাতে পারেননি। এক্ষেত্রে অসাধারণ দৃঢ়তা, ক্ষিপ্রতা ও যোগ্যতা অনেক অনেক বেশি দেখিয়েছেন এম এস ধোনি এবং বিরাট কোহলি। তাহলে এই বিচারেও তো শচীন নম্বর কম পাচ্ছেন, কী বলেন?

এজবাস্টন টেস্টেও ‘টিম ইন্ডিয়া’ দুই ইনিংস মিলিয়ে মোট যা রান করলো তার ৬০ শতাংশই করতে হলো একা অধিনায়ককে। বাস্তবতা হচ্ছে, জেতার জন্য অধিনায়ক বিরাট কোহলি যতোটা আন্তরিকভাবে চেষ্টা করেন, দলের অন্যরা কি একইরকম উদ্যোগ নেন? একজন অধিনায়ক কতো চাপ নিতে পারেন? এ প্রসংগে জিওফ্রে বয়কট বলেন, ‘গত ৪০ বছরে ভারতের কোনো অধিনায়ককে এতোটা চাপ নিয়ে ব্যাট করতে হয়নি।’ অর্থাৎ এখানেও পিছিয়ে থাকলেন সাবেক মাস্টার-ব্লাস্টার শচীন টেন্ডুলকার।

ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক মাইক ব্রিয়ারলি তো বলেছেনই, ‘কোহলিই বিশ্বের সেরা ব্যাটসম্যান। সব ধরনের ক্রিকেটে যার ব্যাটিং গড় ৫০-এর উপরে। ও সত্যিই অসাধারণ ব্যাটসম্যান। কোহলি ৫০ পেরোলে প্রায়ই সেটাকে সেঞ্চুরিতে রূপ দিতে সক্ষম।’ বিরাট শেষ ৮টি সেঞ্চুরি যখন করেছেন, তখন শিখর ধাওয়ান, চেতেশ্বর পূজারা, আজিঙ্কা রাহানে, মুরলী বিজয়দের মতো স্বীকৃত ব্যাটসম্যানরা করেছেন মোট ৮টি সেঞ্চুরি। অর্থাৎ একা বিরাটের অবদান ৫০ শতাংশ, বাকি সবাই মিলে ৫০ শতাংশ।

তবে যতোই দেবতার মুখোশ পরানো হোক না কেন, দিনশেষে এই বিরাট কোহলিও তো মানুষই। খেলা চলাকালে নাসের হুসেইন-হর্ষা ভোগলের একটি তথ্য বিশ্লেষণ করলেই তা প্রতিষ্ঠিত হবে। নাসের-হর্ষা’র ভাষ্য- প্রথম ইনিংসে বিরাট মোট ৪০টি ডেলিভারি ছেড়েছেন অফ-স্টাম্পের বাইরে। এর মধ্যে ২৬টিই অ্যান্ডারসনের। এর চেয়েও বেশি ইন্টারেস্টিং, ১৪৯ করার ফাঁকে আদিল রশিদ ও ব্রডের বিরুদ্ধে তাঁর স্ট্রাইক রেট ওঠা-নামা করেছে ৭৮ থেকে ৮৯-এ। অথচ অ্যান্ডারসনের বলে তা মাত্র ২৮। ব্যাটিং দানব বিরাটের এই পারফরমেন্স কিসের সংগে তুল্য?

৪৭তম ওভারে স্টোকসের তৃতীয় ডেলিভারি ফ্লিক করতে গিয়ে লাইন মিস করেন কোহলি। বল প্যাডে লাগার সংগে সংগে ইংল্যান্ডের জোরালো আবেদনে সাড়া দিয়ে আঙুল তোলেন আম্পায়ার। রিভিউ নেন কোহলি। রিপ্লে দেখেও আম্পায়ার আলিম দার-এর সিদ্ধান্তই বহাল থাকে। দলকে জয়ের মঞ্চে নিতে না পারায় বিরাটের ভাগ্যে ট্র্যাজিক হিরো’র খেতাব মিলেছে ব্রিটিশ প্রচারমাধ্যমে।

গত তিন-চার বছরে অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় এগিয়েছেন বিরাট। দুর্দান্ত কনভার্শন রেট। বিরাটের ক্যাপ্টেন’স নক-এর সেরা দিক হলো, টেলএন্ডারদের নিয়ে ব্যাট করা। ক্যারিয়ারে ক’বার এমন ম্যাজিক দেখাতে পেরেছেন শচীন?

এজবাস্টন টেস্টে কোহালি প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ব্যাট করে খেলেছেন ২২৫ বল। মেরেছেন ২২টি চার ও একটি ছয়। ১৪৯-এ পৌঁছনোর পথে তিনটি ক্যাচ দিয়ে বেঁচে গেছেন বিরাট। স্পষ্ট বুঝা গেছে, অফস্টাম্পের বাইরের দুর্বলতা এখনো কাটতে পারেননি ভারত অধিনায়ক। তবে ৪ বছর আগের তুলনায় অনেক উন্নতি করেছেন। অ্যান্ডারসন প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন বিরাটের উইকেটটির জন্য। ক্যাচ না ছাড়লে হয়তো সফলও হতেন। এমনকি সফল হতেন বেন স্টোকসও।

এজবাস্টনে চতুর্থ দিনের খেলার সময় টিভি পর্দায় গ্যালারিতে একটি পোস্টারে দেখলাম, ‘কোহলি বনাম ইংল্যান্ড’। সত্যিই তো, এই টেস্ট বিরাট কোহলি বনাম ইংল্যান্ড হয়েই থাকলো। ম্যাচ শেষে একটি কাগজে শিরোনাম দেখেও তা-ই মনে হলো- ইংল্যান্ড-১, কোহলি-০।

বার্মিংহামের এজবাস্টনে টস হেরে ভারত যখন প্রথমে ফিল্ডিং করতে নামে তখন বিরাটের নামের পাশে লেখা ছিলো রান ৯৭৭। অর্থাৎ হাজার থেকে ২৩ রান দূরে। গড় ৪৪.৪০। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে মোট ১২ জন ভারতীয় এই রান করেছেন। এবার ১৩ নম্বর হিসেবে সেই তালিকায় ঢুকলেন বিরাট। তালিকার অন্যরা হলেন- সুনীল গাভাসকার (২,৪৮৩ রান), রাহুল দ্রাবিড় (১,৯৫০), গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথ (১,৮৮০), দীলিপ ভেঙ্গ সরকার (১,৫৮৯), কপিল দেব (১,৩৫৫), মহম্মদ আজহারউদ্দিন (১,২৭৮), বিজয় মাঞ্জরেকার (১,১৮১), মহেন্দ্র সিং ধোনি (১,১৫৭), ফারুখ ইঞ্জিনিয়ার (১,১১৩), চেতেশ্বর পূজারা (১,০৬১) ও রবি শাস্ত্রী (১,০২৬)। সর্বশেষ নাম বিরাট কোহলি’র।

প্রায় দশ বছরে অতিমানবীয় ক্রিকেট জীবনে বিরাট কোহলির একটাই কালো দাগ ছিলো এতোদিন। ইংল্যান্ডের মাঠে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে টেস্টে রান না পাওয়া। এবার সেই ব্যর্থতাও মুছে দিয়েছেন। বরং এই সিরিজে নতুন কীর্তির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন বিরাট কোহলি। অধিনায়ক হিসেবে ২১ টেস্টে জিতে সৌরভ গাঙ্গুলি’র সংগে তাঁর রেকর্ড এখন সমান। আর একটি টেস্ট জিতলেই সৌরভকে পেছনে ফেলে ভারতের দ্বিতীয় সফলতম টেস্ট অধিনায়ক হবেন বিরাট।

সুনীল গাভাসকার তো বিরাট কোহলি বলতে অজ্ঞান। বললেন, ‘বিরাট ব্যতিক্রমী প্রতিভা। মাঝরাতে ওকে ঘুম থেকে তুলে দিলে সেই অবস্থায়ও উঠে রান করতে পারে। বরং বাকিদের, যাদের কম প্রতিভা, তারা আরো বেশি করে লাল বলে খেলা অভ্যাস করুক।’ তিনি এমনই। মনে আছে? শচীনকে নিয়েও তাঁর আতিশয্যের কমতি ছিলো না। এমন একজন গ্রেট প্লেয়ার, অথচ তাঁর কথা-মন্তব্য ভীষণ একপেশে, একঘেঁয়ে। বাংলাদেশ নিয়ে মন্তব্যের বেলায় তো শিষ্টাচার-মিষ্টাচারের ধার ধারেন না সুনীল।

ব্যাটসম্যানদের দায়িত্ববোধ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ভরাতের সাবেক অধিনায়ক সুনীল গাভাসকার। তিনি বলেন, ‘বিরাট কোহলি বড় ব্যাটসম্যান। ও জানে কীভাবে রান করতে হয়। কিন্তু বাকিরা? ইংল্যান্ডের পিচে বল স্যুইং করবে। কিন্তু সেটা কীভাবে সামলাতে হবে, সেটা ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা শেখেনি।’

আরেক সাবেক ক্রিকেটার সঞ্জয় মাঞ্জরেকার বলেছেন, ‘দেশের মাটিতে ঝুড়ি ঝুড়ি রান করা সত্ত্বেও বিদেশে সেই ব্যাটসম্যানরা কেন ব্যর্থ, সেটা টিম ম্যানেজমেন্টের দেখা উচিত। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের মনোভাব বদলাতে হবে। ভারতীয় ক্রিকেট যেখানে ছিলো, সেখানেই আটকে আছে। ব্যতিক্রম শুধু বিরাট কোহলি। বাকিদের দেখে মনে হচ্ছে ইংল্যান্ডে ঘুরতে এসেছে। বিরাটকে দেখে বাকিদেরও শেখা উচিত।’

ম্যাচে হার-জিত থাকবেই। কিন্তু তা নিয়ে যেভাবে উচ্ছাস কিংবা ব্যঙ্গ প্রকাশে ব্যস্ত থাকেন বিরাট কোহলি, এ নিয়ে কতো ট্রল হয়েছে ইতিমধ্যে। কিন্তু নিজের শরীরী ভাষা বদলাননি বিরাট। বাংলাদেশের মতো একটি নবীন দলের সংগেও তাঁর শরীরী ভাষা, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ কিংবা রুদ্রভঙ্গি নিয়ে স্যোসাল মিডিয়ায় কতো ঝড় বয়ে গেছে সাম্প্রতিক অতীতে। বাজে মন্তব্য কিংবা রুক্ষ খোঁচা দিতে পিছু হটেননি সুনীল গাভাসকার, সেহবাগ, সৌরভের মতো নন্দিত খেলোয়াড়রাও।

এজবাস্টন টেস্টেও উচ্ছাস প্রকাশের ভাষা নিয়ে বিতর্কের মুখে পড়েছেন বিরাট কোহলি। ম্যাচ রেফারি জেফ ক্রো জানিয়েছেন, প্রথম ইনিংসে জো রুট আউট হওয়ার পর বিরাট যেভাবে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন, তা ক্রিকেটীয় মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছিলো। এটা যে ক্রিকেটীয় শিষ্টাচার নয়, তা ভারত অধিনায়ককে বুঝিয়ে দিয়েছেন ক্রো।

আগামীকাল পড়ুন: ভারতীয় টিমের নাম কী? টিম ইন্ডিয়া না টিম কোহলি?

সম্পর্কিত

ভারতীয় টিমের নাম কী? টিম ইন্ডিয়া না টিম কোহলি?

ডেস্ক রিপোর্ট

বিদেশিদের কাছে ভালো ভাষা ও সংস্কৃতির হালচাল, দেশে বেহাল

ডেস্ক রিপোর্ট

আমাদের সমাজ ব্যবস্থাই সবচেয়ে বড় ধর্ষক

ডেস্ক রিপোর্ট

রংপুরে ভরাডুবি হলেও সুষ্ঠু নির্বাচনের কৌশলে এগিয়ে আওয়ামী লীগ

ডেস্ক রিপোর্ট

জাতীয় রাজনীতি: কী আছে সামনে?

ডেস্ক রিপোর্ট

রোহিঙ্গা সংকট: সরকারের শাঁঁখের করাত

ডেস্ক রিপোর্ট

মতামত